Prathama Yama Sādhana
শ্রীশ্রীভজনরহস্য
(শ্রীশ্রীহরিনাম চিন্তামণির অন্তর্গত)
প্রথমযাম সাধন
নিশান্তভজন—শ্রদ্ধা
(রাত্রের শেষ ছয়দণ্ড)
কৃষ্ণবর্ণং ত্বিষাঽকৃষ্ণং সাঙ্গোপাঙ্গাস্ত্রপার্ষদম্।
যজ্ঞৈঃ সংকীৰ্ত্তনপ্রায়ৈভজামি কলিপাবনম্॥১॥
নিজত্বে গৌড়ীয়ান্ জগতি পরিগৃহ্য প্রভুরিমান
হরে কৃষ্ণেত্যেবং গণনবিধিনা কীৰ্ত্তয়ত ভোঃ।
ইতি প্রায়াং শিক্ষাং চরণমধুপেভ্যঃ পরিদিশন্
শচীসূনুঃ কিং মে নয়নসরণীং যাস্যতি পদং॥২॥
(স্তবাবলী)
যিনি কৃষ্ণনাম কীৰ্ত্তনকারী, কান্তিতে অকৃষ্ণ (গৌরবর্ণ), অঙ্গ, উপাঙ্গ, অস্ত্র ও পার্ষদগণ-পরিবৃত, সেই কলিযুগপাবন শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুকে সংকীৰ্ত্তন-প্রাধান্য অর্চ্চনাদি যজ্ঞের দ্বারা আমি ভজনা করি। (এখানে কৃষ্ণবর্ণ, অথচ কান্তিতে অকৃষ্ণ—ইহা বলায়, যিনি অন্তঃকৃষ্ণ ও বহিঃ গৌরবর্ণ, তাঁহাকে, অথবা—কৃষ্ণ এই নাম যিনি বর্ণনা (কীৰ্ত্তন) করিতেছেন, কিম্বা—যাঁহার (শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য) নামের মধ্যে ‘কৃষ্ণ' এই দুইটি বর্ণ রহিয়াছে, তাঁহাকে। শ্রীবিগ্রহের হস্ত-পাদাদি অঙ্গসমূহই যাঁহার উপাঙ্গ (ভূষণাদি), মহাপ্রভাবশালীহেতু সেই অঙ্গই অস্ত্রাদি, সদা একান্তবাসী বলিয়া তাহাই পার্ষদাদি, অথবা—শ্রীঅদ্বৈত, নিত্যানন্দ, গদাধর, শ্রীবাস প্রভৃতি পার্ষদ-পরিবৃত পঞ্চতত্ত্বাত্মক শ্রীগৌরসুন্দরের ভজনা করি—ইত্যাদি বহুবিধ অর্থ সন্দর্ভাদিতে আস্বাদ্য।)॥১॥
যে প্রভু, এই গৌড়দেশীয় জনগণকে জগতে আত্মীয়রূপে অঙ্গীকার বশতঃ ‘ওহে! তোমরা সংখ্যাবিধির দ্বারা ‘হরে কৃষ্ণ'—এইরূপ (শ্রীহরিনাম) কীৰ্ত্তন কর'—এবম্বিধ শিক্ষা স্বচরণকমলের মধুকরগণকে (স্বীয় ভক্তবৃন্দকে) উপদেশ প্রদান করেন, সেই শচীসূত শ্রীগৌরসুন্দর কি আমার নয়নপথের পথিক হইবেন?॥২॥
কলিজীব উদ্ধারিতে পরতত্ত্ব হরি।
নবদ্বীপে আইলা গৌররূপ আবিষ্করি'॥
যুগধর্ম্ম কৃষ্ণনাম স্মরণ কীৰ্ত্তন।
সাঙ্গোপাঙ্গে বিতরিল দিয়া প্রেমধন॥
জীবের সুনিত্য ধর্ম্ম নাম সংকীৰ্ত্তন।
অন্য সব ধৰ্ম্ম নাম সিদ্ধির কারণ॥
────────────────────
বিষ্ণুরহস্যে—
যদভ্যর্চ্চ হরিং ভক্ত্যা কৃতে ক্রতুশতৈরপি।
ফলং প্রাপ্নোত্যবিকলং কলৌ গোবিন্দকীৰ্ত্তনাৎ॥৩॥
সত্যযুগে শত শত যজ্ঞের দ্বারা ভক্তিতে শ্রীহরির অর্চ্চনা করতঃ যে ফল লাভ হইত, এই কলিযুগে কেবলমাত্র ‘গোবিন্দ’-নাম কীর্তনের দ্বারাই সেইরূপ সম্পূর্ণ ফলই প্রাপ্ত হওয়া যায়॥৩॥
সত্যযুগে শত শত যজ্ঞে হৰ্য্যৰ্চ্চন।
কলিতে গোবিন্দনামে সে ফল অর্জন॥
────────────────────
বৃহদ্বিষ্ণুপুরাণে,—নামে অন্য প্রায়শ্চিত্ত নিষেধ—
নাম্নোহস্য যাবতী শক্তিঃ পাপনির্ভরণে হরেঃ।
তাবৎ কৰ্ত্তুং ন শক্লোতি পাতকং পাতকী জনঃ॥৪॥
পাপ নাশ করিতে এই শ্রীহরির নামের যত শক্তি রহিয়াছে, পাতকী জন তত পাপ করিতেও সক্ষম হয় না॥৪॥
কোন প্রায়শ্চিত্ত নহে নামের সমান।
অতএব কৰ্ম্মত্যাগ করে বুদ্ধিমান্॥
────────────────────
বৈষ্ণব চিন্তামণৌ, (হরিভক্তিবিলাস ১১।২৩৬ সংখ্যাধৃত) কীর্ত্তনের শ্রেষ্ঠতা।
অঘচ্ছিৎস্মরণং বিষ্ণোর্বহ্বায়াসেন সাধ্যতে।
ওষ্ঠস্পন্দনমাত্রেণ কীৰ্ত্তনন্তু ততো বরম্॥৫॥
পাপ-বিনাশক বিষ্ণুর স্মরণ বহু আয়াস-সাধ্য, কিন্তু তদপেক্ষা কেবল অধরোষ্ঠ স্পন্দনমাত্রে তাঁহার শ্রীনাম কীর্ত্তন শ্রেষ্ঠ এবং সহজসাধ্য॥৫॥
তপস্যায় ধ্যানযোগ কষ্টসাধ্য হয়।
ওষ্ঠের স্পন্দনমাত্রে কীৰ্ত্তন আশ্ৰয়॥
ওষ্ঠের স্পন্দনাভাবে নামের স্মরণ।
স্মরণকীর্তনে সর্ব্বসিদ্ধি সংঘটন॥
অর্চ্চন অপেক্ষা নামের স্মরণ কীৰ্ত্তন।
অতিশ্রেষ্ঠ বলি শাস্ত্রে করিল স্থাপন॥
────────────────────
(হরিভক্তিবিলাস ১১।২৩৭ সংখ্যাধৃত শাস্ত্রবাক্য—)
যেন জন্মশতৈঃ পূৰ্ব্বং বাসুদেবঃ সমর্চ্চিতঃ।
তন্মুখে হরিনামানি সদা তিষ্ঠন্তি ভারত॥৬॥
হে ভারত! পূর্ব্বে শত শত জন্মে যিনি বাসুদেবকে সম্যরূপে অর্চ্চনা করিয়াছেন, তাঁহার বদনেই শ্রীহরিনাম সর্ব্বদা বৰ্ত্তমান থাকেন (কীৰ্ত্তিত হইয়া থাকেন)॥৬॥
হরেকৃষ্ণ ষোলনাম অষ্টযুগ হয়।
অষ্টযুগ অর্থে অষ্টশ্লোক প্ৰভু কয়॥
আদি হরেকৃষ্ণ অর্থে অবিদ্যাদমন।
শ্রদ্ধার সহিত কৃষ্ণনামসংকীৰ্ত্তন॥
আর হরেকৃষ্ণ নাম কৃষ্ণ সৰ্ব্বশক্তি।
সাধুসঙ্গে নামাশ্রয়ে ভজনানুরক্তি॥
সেইত ভজনক্রমে সৰ্ব্বানৰ্থনাশ।
অনর্থাপগমে নামে নিষ্ঠার বিকাশ॥
তৃতীয়ে বিশুদ্ধভক্ত চরিত্রের সহ।
কৃষ্ণ কৃষ্ণনামে নিষ্ঠা করে অহরহ॥
চতুর্থে অহৈতুকী ভক্তি উদ্দীপন।
রুচি সহ হরে হরে নামসংকীর্ত্তন॥
পঞ্চমেতে শুদ্ধ দাস্য রুচির সহিত।
হরেরাম সংকীর্ত্তন স্মরণবিহিত॥
ষষ্ঠে ভাবাঙ্কুরে হরে রামেতি কীর্ত্তন।
সংসারে অরুচি কৃষ্ণে রুচি সমর্পণ॥
সপ্তমে মধুরাসক্তি রাধাপদাশ্রয়।
বিপ্রলম্ভে রামরাম নামের উদয়॥
অষ্টমে ব্ৰজেতে অষ্টকাল গোপীভাব।
রাধাকৃষ্ণপ্রেমসেবা প্রয়োজন লাভ॥
────────────────────
যথা,—ভঃ রঃ সিঃ পূৰ্ব্ব বিঃ ৪র্থ লঃ ১১ শ্লোক।
আদৌ শ্রদ্ধা ততঃ সাধুসঙ্গোহথ ভজনক্রিয়া।
ততোহর্থনিবৃত্তিঃ স্যাত্ততো নিষ্ঠা রুচিস্ততঃ॥
অথাসক্তিস্ততো ভাবস্তুতঃ প্রেমাভ্যুদঞ্চতি।
সাধকানাময়ং প্রেম্নঃ প্রাদুর্ভাবে ভবেৎ ক্রমঃ॥৭॥
প্রথমে শ্রদ্ধা, তারপর সাধুসঙ্গ, অনন্তর ভজনক্রিয়া, তাহা হইতে অনর্থ (যাহা ভক্তির প্রতিবন্ধক) নিবৃত্তি হয়, তাহা হইতে নিষ্ঠা ও রুচি জন্মে। অনন্তর আসক্তি, তারপর ভাব, তাহা হইতে প্রেম উদিত হয়। সাধকগণের প্রেমের প্রাদুর্ভাব ইহাই প্রামাণিক ক্রম॥৭॥
ভক্তিমূলা সুকৃতি হইতে শ্রদ্ধোদয়।
শ্রদ্ধা হৈলে সাধুসঙ্গ অনায়াসে হয়॥
সাধুসঙ্গফলে হয় ভজনের শিক্ষা।
ভজনশিক্ষার সঙ্গে নামমন্ত্ৰদীক্ষা॥
ভজিতে ভজিতে হয় অনর্থের ক্ষয়।
অনর্থ খৰ্ব্বিত হইলে নিষ্ঠার উদয়॥
নিষ্ঠা নামে যত হয় অনর্থবিনাশ।
নামে তত রুচি ক্রমে হইবে প্রকাশ॥
রুচিযুক্ত নামেতে অনৰ্থ যত যায়।
ততই আসক্তি নামে ভক্তজন পায়॥
নামাসক্তি ক্রমে সর্ব্বানর্থ দূর হয়।
তবে ভাবোদয় হয় এইত নিশ্চয়॥
ইতি মধ্যে অসৎসঙ্গে প্রতিষ্ঠা জন্মিয়া।
কুটীনাটী দ্বারে দেয় নিম্নে ফেলাইয়া॥
অতি সাবধানে ভাই অসৎসঙ্গ ত্যজ।
নিরন্তর পরানন্দে হরিনাম ভজ॥
────────────────────
যথা, কাত্যায়নসংহিতায়,—(ভঃ রঃ সিঃ পূঃ বিঃ ২।৫১ শ্লোকধৃত)
বরং হুতবহজ্বালা-পঞ্জরান্তর্ব্যবস্থিতিঃ।
ন শৌরিচিন্তাবিমুখ-জনসম্বাস-বৈশসম্॥৮॥
বরং অগ্নিজ্বালাময় পঞ্জরেও অবস্থান করা ভাল, তথাপি শ্রীকৃষ্ণচিন্তা-বিমুখ জনের সহিত একত্র বাসরূপ বিপত্তি যেন না হয়॥৮॥
যথা,—বিষ্ণুরহস্যে
আলিঙ্গনং বরং মন্যে ব্যালব্যাঘ্রজলৌকসাম্।
ন সঙ্গঃ শল্যযুক্তানাং নানাদেবৈকসেবিনাম্॥৯॥
বরং সর্প, ব্যাঘ্র ও কুম্ভীরাদি জলচর প্রাণীর আলিঙ্গনও ভাল, তথাপি পাপী (কৃষ্ণভক্ত-দ্বেষী) নানা দেব-দেবীর উপাসকগণের সঙ্গ যেন না হয়॥৯॥
অগ্নিতে পুড়ি বা পঞ্জরেতে বদ্ধ হই।
তবু কৃষ্ণবহির্মুখসঙ্গ নাহি লই॥
বরং সর্পব্যাঘ্রকুম্ভীরের আলিঙ্গন।
অন্যসেবিসঙ্গ নাহি করি কদাচন॥
────────────────────
অতএব নামাভাসে সর্ব্বপাপ বিনাশ ও সংসারক্ষয়। যথা,― (ভঃ রঃ সিঃ দঃ বিঃ ১।৫২)
তং নির্ব্যাজং ভজ গুণনিধিং পাবনং পাবনানাং
শ্রদ্ধারজ্যন্মতিরতিতরামুত্তমঃশ্লোকমৌলিম্।
প্রোদ্যন্নন্তঃকরণকুহরে হন্ত যন্নামভানো-
রাভাসোঽপি ক্ষপয়তি মহাপাতকধ্বান্তরাশিম্॥১০॥
সেই অখিলকল্যাণ-গুণনিধি, পাবনেরও পাবন উত্তমঃশ্লোকমৌলি শ্রীকৃষ্ণেরই শ্রদ্ধাসহকারে শুদ্ধমতি হইয়া নিষ্কপটে ভজনা কর, অহো! যাঁহার নামরূপ সূর্য্যের আভাসমাত্রও অন্তঃকরণরূপ (অন্ধকার) গহ্বরে উদয় হইয়া মহাপাতকরূপ অন্ধকাররাশিকেও নাশ করে॥১০॥
পরম পাবন কৃষ্ণ তাঁহার চরণ।
নিষ্কপট শ্রদ্ধা সহ করহ ভজন॥
যাঁর নাম সূর্য্যাভাস অন্তরে প্রবেশি’।
ধ্বংস করে মহাপাপ অন্ধকাররাশি॥
এই শিক্ষাষ্টকে কহে কৃষ্ণলীলা ক্ৰম।
ইহাতে ভজনক্রমে লীলার উদ্গম॥
প্রথমে প্রথম শ্লোক ভজ কিছু দিন।
দ্বিতীয় শ্লোকেতে তবে হওত প্রবীণ॥
চারি শ্লোকে ক্রমশঃ ভজন পক্ব কর।
পঞ্চম শ্লোকেতে নিজসিদ্ধদেহ বর॥
ঐ শ্লোকে সিদ্ধদেহে রাধাপদাশ্রয়।
আরম্ভ করিয়া ক্রমে উন্নতি উদয়॥
ছয় শ্লোক ভজিতে অনর্থ দূরে গেল।
তবে জান সিদ্ধদেহে অধিকার হৈল॥
অধিকার না লভিয়া সিদ্ধদেহ ভাবে।
বিপর্য্যয় বুদ্ধি জন্মে শক্তির অভাবে॥
সাবধানে ক্রম ধর যদি সিদ্ধি চাও।
সাধুর চরিত দেখি শুদ্ধবুদ্ধি পাও॥
সিদ্ধদেহ পেয়ে ক্রমে ভজন করিলে।
অষ্টকাল সেবাসুখ অনায়াসে মিলে॥
শিক্ষাষ্টক চিত্ত, কর স্মরণ কীৰ্ত্তন।
ক্রমে অষ্টকাল সেবা হবে উদ্দীপন॥
সকল অনর্থ যাবে পাবে প্রেমধন।
চতুৰ্ব্বর্গ ফল্গু প্রায় হবে অদর্শন॥
────────────────────
অথ ভজনক্রম—শিক্ষাষ্টক ১ম শ্লোকঃ—(১) নামে চিত্তদর্পণ মাৰ্জ্জিত হয়,
চেতোদর্পণমাৰ্জ্জনং ভবমহাদাবাগ্নিনির্ব্বাপণং
শ্রেয়ঃকৈরবচন্দ্রিকাবিতরণং বিদ্যাবধূজীবনম্।
আনন্দাম্বুধিবৰ্দ্ধনং প্রতিপদং পূর্ণামৃতাস্বাদনং
সর্ব্বাত্মস্নাপনং পরং বিজয়তে শ্রীকৃষ্ণসংকীৰ্ত্তনম্॥১১॥
যিনি চিত্তরূপ দর্পণের মলনাশক, সংসারস্বরূপ মহাদাবানলের নির্ব্বাপক, কল্যাণরূপ কুমুদের প্রকাশবিষয়ে জ্যোৎস্নাপ্রদ (অর্থাৎ চন্দ্ৰতুল্য), বিদ্যারূপা (ভক্তিরূপা) বধূর জীবনস্বরূপ, আনন্দসমুদ্রের বৃদ্ধিকর এবং পদে পদে সম্পূর্ণ অমৃতের আস্বাদ-স্বরূপ ও অন্তঃকরণের তাপনাশক, এতাদৃশ সর্ব্বোৎকৃষ্ট ‘শ্রীকৃষ্ণ-সঙ্কীৰ্ত্তন' জয়যুক্ত হউন॥১১॥
সংকীৰ্ত্তন হৈতে পাপ সংসার নাশন।
চিত্তশুদ্ধি সৰ্ব্বভক্তি সাধন উদ্গম॥
কৃষ্ণ-প্রেমোদ্গম প্রেমামৃত আস্বাদন।
কৃষ্ণপ্রাপ্তি, সেবামৃত-সমুদ্রে মজ্জন॥
────────────────────
শ্রীরূপ-গোস্বামি-কৃত নামাষ্টক ৭ম শ্লোক—
সূদিতাশ্রিতজনার্ভিরাশয়ে
রম্যচিদঘনসুখস্বরূপিণে।
নাম গোকুলমহোৎসবায় তে
কৃষ্ণপূর্ণবপুষে নমো নমঃ ॥১২॥
হে শ্ৰীকৃষ্ণাভিন্ন-বিগ্রহ শ্রীনাম! আপনি আশ্রিত জনের আর্ত্তিবিনাশক ভক্তগণের অভিপ্রায়ে মনোহর চিদঘন সুখ-স্বরূপ এবং গোকুলবাসিদিগের মূৰ্ত্তিমান্ আনন্দরূপ, আপনার অবয়বসমূহ মাধুর্য্যাদিতে পরিপূর্ণ, আপনাকে পুনঃ পুনঃ প্রণতি জ্ঞাপন করি ॥১২॥
আশ্রিত জনের সব আর্তিনাশ করি'।
অতিরম্য চিদঘন স্বরূপে বিহরি ॥
গোকুলের মহোৎসব কৃষ্ণ পূর্ণরূপ।
হেন নামে নমি প্রেম পাই অপরূপ ॥
নামসংকীর্তনে হয় সৰ্ব্বানৰ্থ নাশ।
সৰ্ব্বশুভোদয় কৃষ্ণে প্রেমের উল্লাস ॥
────────────────────
অষ্টাঙ্গ যোগপথে সৰ্ব্বদা ভয়সঙ্কুল—যথা ভাগবতে (১। ৬। ৩৬)
যমাদিভিযোগপথৈঃ কামলোভহতো মুহুঃ।
মুকুন্দসেবয়া যদ্বৎ তথাদ্ধাত্মা ন শাম্যতি ॥১৩॥
নিয়ত কাম ও লোভাদিতে আসক্তচিত্ত ব্যক্তি মুকুন্দ-সেবার দ্বারা যেরূপ সাক্ষাৎ শমতা প্রাপ্ত হয়, যম এবং নিয়মাদি যোগপথের দ্বারা তদ্রূপ শান্তি হয় না ॥১৩॥
যোগে শুদ্ধ করি' চিত্তে একাগ্রহ করে।
বহুস্থলে এ কথার ব্যতিক্রম ধরে ॥
────────────────────
কর্ম্ম-জ্ঞানাদির নিন্দা, যথা ভাগবতে (১। ৫। ১২)—
নৈষ্কর্ম্মমপ্যচ্যুত-ভাববর্জ্জিতং
ন শোভতে জ্ঞানমলং নিরঞ্জনম্।
কুতঃ পুনঃ শশ্বদভদ্রমীশ্বরে
ন চার্পিতং কৰ্ম্ম যদপ্যকারণম্ ॥১৪॥
সকল বাসনাশূন্য কেবল ক্ষেত্রজ্ঞবিষয়ক নৈষ্কর্ম্ম জ্ঞানও অচ্যুতভাবরহিত হইলে সম্যরূপে শোভিত হয় না। যে নিষ্কাম কর্ম্ম শ্রেষ্ঠ, তাহাও পরমেশ্বরে সমর্পিত না হইলে শোভা পায় না। আর, ঈশ্বরে অনর্পিত নিয়ত অমঙ্গলরূপ যে কাম্য ও অকাম্য কর্ম্ম, ইহারা হরিভক্তি-বর্জ্জিত হইলে যে শোভা পাইবে না, তাহাতে আর বক্তব্য কি? ॥১৪॥
নিরঞ্জন কৰ্ম্মাতীত, কভু জ্ঞান সুশোভিত,
শুদ্ধভক্তি বিনা নাহি হয়।
স্বভাব অভদ্ৰ কৰ্ম্ম, হলেও নিষ্কাম ধৰ্ম্ম,
কৃষ্ণার্পিত নৈলে শুভ নয় ॥
────────────────────
অভক্তিমার্গ ভাগবতে নিন্দিত যথা (ভাঃ ১০। ১৪। ৪)—
শ্রেয়ঃসৃতিং ভক্তিমুদস্য তে বিভো
ক্লিশ্যন্তি যে কেবলবোধলব্ধয়ে।
তেষামসৌ ক্লেশল এব শিষ্যতে
নান্যদ্ যথা স্থূলতুষাবঘাতিনাম্ ॥১৫॥
হে বিভো! পরম কল্যাণজনক উপায়সমূহের পথস্বরূপ তোমার ভক্তি পরিত্যাগ করিয়া, যাহারা কেবলমাত্র জ্ঞান লাভের জন্য বিশেষ ক্লেশ স্বীকার করে, তাহাদের অল্প পরিমাণ ধান্যের পরিবর্তে অধিক পরিমাণ তুষ অবঘাতের (ভানার) ন্যায়, ঐ ক্লেশই সার হইয়া থাকে, ফল কিছুই লাভ হয় না ॥১৫॥
ভক্তিপথ ছাড়ি করে জ্ঞানের প্রয়াস।
মিছে কষ্ট পায় তার হয় সর্ব্বনাশ ॥
অতি কষ্টে তুষ কুটি' তণ্ডুল না পায়।
ভক্তিশূন্য জ্ঞানে তথা বৃথা দিন যায় ॥
────────────────────
(২) নামে ভবমহাদাবাগ্নি অনায়াসে নির্ব্বাপিত হয়, যথা ভাগবতে (৬। ২। ৪৬)—
নাতঃ পরং কর্ম্মনিবন্ধকৃত্তনং
মুমুক্ষতাং তীর্থ-পদানুকীৰ্ত্তনাৎ।
ন যৎ পুনঃ কৰ্ম্মসু সজ্জতে মনো
রজস্তমোভ্যাং কলিলং ততোহন্যথা ॥১৬॥
তীর্থপদ শ্রীভগবানের কীর্ত্তন ব্যতীত অন্য কিছুই পাপের মূলোচ্ছেদক নহে। এতদ্ভিন্ন যে অন্যান্য প্রায়শ্চিত্ত আছে, তাহাতে মন রজঃ ও তমোগুণের দ্বারা মলিন হইয়াই থাকে, কিন্তু ভগবৎকীৰ্ত্তনে সেই মন একান্ত নিৰ্ম্মল হয়, পুনরায় কর্ম্মে আসক্ত হয় না ॥১৬॥
কৰ্ম্মবন্ধ সুখণ্ডন, মোক্ষপ্রাপ্তি সংঘটন,
কৃষ্ণনাম-কীৰ্ত্তনে সাধয়।
কর্ম্মচক্র রজস্তমঃ, পূর্ণরূপে বিনির্গম,
নাম বিনা নাহি অন্যোপায় ॥
────────────────────
যথা, পদ্মপুরাণ উত্তরখণ্ড ৪৬ অধ্যায়—
সকৃদুচ্চারিতং যেন হরিরিত্যক্ষরদ্বয়ম্।
বদ্ধঃ পরিকরতেন মোক্ষায় গমনং প্রতি ॥১৭॥
একবারমাত্র যে ব্যক্তি ‘হরি’–এই অক্ষর দুইটি উচ্চারণ করে, সে মোক্ষ-প্রাপ্তির জন্য বদ্ধ-পরিকর (প্রস্তুত) হয়, অর্থাৎ অনায়াসে তাহার মোক্ষ-লাভ হয় ॥১৭॥
যাঁর মুখে একবার নাম নৃত্য করে।
মোক্ষসুখ অনায়াসে পায় সেই নরে ॥
────────────────────
(৩) নাম সমস্ত শ্রেয়ের কৈরব চন্দ্রিকা বিতরণ করেন, যথা প্রভাস-খণ্ডে—
মধুর-মধুরমেতন্মঙ্গলং মঙ্গলানাং
সকলনিগমবল্লী সৎফলং চিৎস্বরূপম্।
সকৃদপি পরিগীতং শ্রদ্ধয়া হেলয়া বা
ভৃগুবর নরমাত্রং তারয়েৎ কৃষ্ণনাম ॥১৮॥
হে ভৃগুশ্রেষ্ঠ! মধুর হইতেও মধুর, সকল মঙ্গলের মঙ্গল-স্বরূপ এবং সকল বেদলতার সৎফল ও চৈতন্যস্বরূপ এই শ্রীকৃষ্ণনাম যদি একবার শ্রদ্ধায় অথবা হেলায় (অনায়াসে, অবজ্ঞাপূর্ব্বক নহে) উচ্চারিত হন, তাহা হইলে ঐ শ্রীনাম নরমাত্রকেই উদ্ধার করে ॥১৮॥
সকল মঙ্গল হৈতে পরম মঙ্গল।
চিৎস্বরূপ সনাতন বেদবল্লী ফল ॥
কৃষ্ণনাম একবার শ্রদ্ধায় হেলায়।
যাঁহার বদনে সেই মুক্তি সুনিশ্চয় ॥
────────────────────
(৪) নামই বিদ্যাবধূর জীবন। যথা,—গারুড়ে—
যদিচ্ছসি পরং জ্ঞানং জ্ঞানাদ যৎ পরমং পদম্।
তদাদরেণ রাজেন্দ্র কুরু গোবিন্দকীৰ্ত্তনম্ ॥১৯॥
হে মহারাজ! যদি পরম জ্ঞান ইচ্ছা করেন, অথবা জ্ঞান হইতেও যাহা শ্রেষ্ঠ পদ (ভক্তি) ইচ্ছা করেন, তাহা হইলে সাগ্রহে শ্রীগোবিন্দের নাম কীৰ্ত্তন করুন ॥১৯॥
পরম জ্ঞান হৈতে যে পরম পদ পায়।
গোবিন্দকীৰ্ত্তন সেই করহ শ্রদ্ধায় ॥
────────────────────
যথা, দেবগণ বচন (ভাঃ ৩। ৫। ৪০)—
ধাতদস্মিন্ ভব ঈশ জীবা-
স্তাপত্রয়েণাভিহতা ন শৰ্ম্ম।
আত্মন্ লভন্তে ভগবংস্তবাঘি-
চ্ছায়াং সবিদ্যামত আশ্রয়েম ॥২০॥
হে ঈশ্বর! এই সংসারে জীবগণ আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক ও আধিভৌতিক-রূপ তাপত্রয়ে অভিভূত হইয়া কোন প্রকার সুখ লাভ করিতে পারে না। অতএব হে ভগবন্! ত্রিতাপ-নিবর্ত্তক, বিদ্যাপ্রাপক (জ্ঞানস্বরূপ) আপনার চরণকমলের শরণাগতিরূপ ছায়ার আমরা আশ্রয় গ্রহণ করিতেছি ॥২০॥
এ সংসারে তাপত্রয়, অভিহিত জীবচয়,
ওহে কৃষ্ণ না লভে মঙ্গল।
শুভ দাতা অনবদ্যা, তব পদছায়া বিদ্যা,
তদাশ্রয়ে সৰ্ব্বশুভ ফল ॥
────────────────────
“সা বিদ্যা তন্মতিৰ্য্যয়া”॥২১॥
তাহাই বিদ্যা (অর্থাৎ ভক্তি), যাহার দ্বারা শ্রীভগবানে মতির উদয় হয়॥২১॥
যে শক্তিতে কৃষ্ণে মতি করে উদ্ভাবন।
বিদ্যানামে সেই করে অবিদ্যা খণ্ডন॥
কৃষ্ণনাম সেই বিদ্যাবধূর জীবন।
কৃষ্ণপাদপদ্মে যে করয়ে স্থির মন॥
────────────────────
(৫) নামে আনন্দসমুদ্র বৃদ্ধি করেন। যথা (ভাগবত ৮। ৩। ২০)—
একান্তিনো যস্য ন কঞ্চনার্থং
বাঞ্ছন্তি যে বৈ ভগবৎপ্ৰপন্নাঃ।
অত্যদ্ভুতং তচ্চরিতং সুমঙ্গলং
গায়ন্ত আনন্দসমুদ্রমগ্নাঃ॥২২॥
একান্তী ভগবৎপ্রপন্ন জনগণ ভগবানের নিকট কোনও বস্তুরই প্রার্থনা করেন না, তাঁহারা ভগবানের অতি অদ্ভুত মঙ্গলপ্রদ লীলাবলী কীর্ত্তন করতঃ আনন্দসাগরে মগ্ন হইয়া থাকেন॥২২॥
অকিঞ্চন হয়ে করে একান্ত কীৰ্ত্তন।
আনন্দসমুদ্রে মগ্ন হয় সেইজন॥
────────────────────
(৬) নামের প্রতিপদে পূর্ণামৃতাস্বাদন হয়। যথা পদ্মপুরাণে;—
তেভ্যো নমোহস্তু ভববারিধিজীর্ণপঙ্ক
সংমগ্নমোক্ষণবিচক্ষণ-পাদুকেভ্যঃ।
কৃষ্ণেতি বর্ণযুগলং শ্রবণেন যেষাম
আনন্দথুর্ভবতি নৰ্ত্তিতরোমবৃন্দঃ॥২৩॥
যাঁহাদের ‘কৃষ্ণ’—এই বর্ণদ্বয় শ্রবণমাত্রেই রোমাবলি পুলকিত এবং হৃদয়ে আনন্দ উৎপন্ন হয়, ভবসমুদ্রের জীর্ণ পঙ্কে সংমগ্ন জনসমূহের মোক্ষণ-বিষয়ে বিচক্ষণ, তাঁহাদের সেই পাদুকাসকলের উদ্দেশ্যেই আমার প্রণতি রহুক॥২৩॥
কৃষ্ণনাম শুনি রোমবৃন্দ নৃত্য করে।
আনন্দকম্পন হয় যাঁহার শরীরে॥
ভবসিন্ধু পঙ্কমগ্ন জীবের উদ্ধার।
বিচক্ষণ তিঁহো নমি চরণে তাঁহার॥
────────────────────
(৭) নামে সৰ্ব্বাত্মস্নপন হয়। যথা (ভাগবত ১২। ১২। ৪৮)—
সংকীৰ্ত্তমানো ভগবাননন্তঃ
শ্রুতানুভাবো ব্যসনং হি পুংসাম্।
প্রবিশ্য চিত্তং বিধুনোত্যশেষং
যথাতমোহর্কোহভ্রমিবাতিবাতঃ॥২৪॥
শ্রীভগবানের প্রভাব শ্রবণ করিলে এবং তাঁহার নাম ও অদ্ভুত কর্ম্মাদি সম্যরূপে কীৰ্ত্তন করিলে, ভগবান্ অনন্ত সেই শ্রবণ ও কীর্ত্তনকারী ব্যক্তিগণের চিত্তে প্রবেশ করতঃ, সূর্য্যের অন্ধকার দূর করার ন্যায় এবং প্রবল বায়ুর মেঘ বিদূরিত করার ন্যায়, তাহাদের সমস্ত দুঃখ দূর করিয়া থাকেন॥২৪॥
শ্ৰুত অনুভূত যত অনৰ্থ সংযোগ।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে সব হয় ত বিয়োগ॥
যেরূপ বায়ুতে মেঘ, সূৰ্য্য তমঃ নাশে।
চিত্তে প্রবেশিয়া দোষ অশেষ বিনাশে॥
কৃষ্ণনামাশ্রয়ে চিত্তদর্পণ মার্জ্জন।
অতিশীঘ্র লভে জীব কৃষ্ণ প্রেমধন॥
────────────────────
নাম কৃষ্ণ চৈতন্যরসময় মাধুৰ্য্যবিগ্রহ যথা, নামাষ্টক ৮ম শ্লোক,—
নারদবীণোজ্জীবন-
সুধোর্ম্মিনির্য্যাসমাধুরীপূর।
ত্বং কৃষ্ণনাম কামং
স্ফুর মে রসনে রসেন সদা॥২৫॥
হে কৃষ্ণনাম! তুমি নারদের বীণার উজ্জীবন-স্বরূপ, তোমার মাধুর্য্য-প্রবাহ অমৃত-তরঙ্গের সারাংশ-স্বরূপ, সুতরাং আমার জিহ্বাতে সর্ব্বদা সানুরাগে স্ফুরিত হও॥২৫॥
মুনিবীণা উজ্জীবন সুধোৰ্ম্মি নিৰ্য্যাস।
মাধুরীতে পরিপূর্ণ কৃষ্ণনামোচ্ছ্বাস॥
সেই নাম অনর্গল আমার রসনে।
নাচুন রসের সহ এই বাঞ্ছা মনে॥
────────────────────
নাম মুক্তকুলের উপাস্য, নামাভাস সর্ব্বসত্তাপহর,—যথা, নামাষ্টক ২য় শ্লোক,—
জয় নামধেয় মুনিবৃন্দগেয়
জনরঞ্জনায় পরমাক্ষরাকৃতে।
ত্বমনাদরাদপি মনাগুদীরিতং
নিখিলোগ্রতাপপটলীং বিলুম্পসি॥২৬॥
হে শ্রীনাম! মুনিগণ তোমাকে সর্ব্বদা উচ্চারণ করেন, (সন্দিগ্ধ) জনগণের মনোরঞ্জনের নিমিত্ত তুমি কেবল অক্ষরাবয়ব ধারণ করিয়াছ, এবং অনাদরপূর্ব্বকও তোমাকে কেহ যদি অত্যল্পও (মনাক্) উচ্চারণ করে, তবে তাহার নিখিল ভয়ানক পাপসমূহকে তুমি লুপ্ত করিয়া থাক, অতএব হে ‘শ্ৰীকৃষ্ণনাম’! তুমি জয়যুক্ত হও, অর্থাৎ জনগণের পাপরাশি দগ্ধপূর্ব্বক নিজ উৎকর্ষ প্রকাশ কর॥২৬॥
জীব শিব লাগি পরমাক্ষর আকার।
মুনিবৃন্দ গায় শ্রদ্ধা করি অনিবার॥
জয় জয় হরিনাম অখিলোগ্ৰতাপ।
নাশ কর হেলাগানে এ বড় প্রতাপ॥
────────────────────
অতএব নামতত্ত্ব কহিতেছেন, যথা বেদবাক্যসমূহ; (ঋগ্বেদ ১ম মণ্ডল ১৫৬ সূক্ত ৩য়া ঋক্)—
ওমিত্যেতব্রহ্মণো নেদিষ্টং নাম যস্মাদুচ্চার্য্যমাণ
এব সংসারভয়াত্তারয়তি তস্মাদুচ্যতে তার ইতি॥২৭॥
ওঁ অস্য জানন্তো নাম চিদ্বিবিক্তং মহস্তে
বিষ্ণো সুমতিং ভজামহে ওঁ তৎ সৎ॥২৮॥
ততোহভূত্রিবৃদোঙ্কারো যোহব্যক্তপ্রভবঃ স্বরাট্।
যত্তল্লিঙ্গং ভগবতো ব্রহ্মণঃ পরমাত্মনঃ॥২৯॥
ওঁকার (প্রণব) ব্রহ্মের সমীপতম নাম, যাঁহা উচ্চারণমাত্রই সংসার ভয় হইতে (জীবকে) তারণ করেন, এই হেতু ‘তার’, অর্থাৎ ‘তারকব্রহ্ম’ নাম বলা হয়॥২৭॥
বিষ্ণুর মুখ হইতে প্রকটিত চিন্ময় প্রভাবশালী সুমতি প্রদায়ক ওঁকারকে আমরা ভজনা করি। ওঁ তৎসৎ॥২৮॥
সেই অব্যক্ত ত্রিবৃৎ (অ, উ, ম) ওঁ কার হইতে স্বয়ং স্বতন্ত্র স্বপ্রকাশ-রূপ প্রকটিত হইলেন। যাঁহা ভগবান্, ব্রহ্ম এবং পরমাত্মারূপে লক্ষিত হইতেছেন॥২৯॥
অব্যক্ত হইতে কৃষ্ণ স্বরাট্ স্বতন্ত্র।
ব্রহ্ম আত্মা ভগবান্ লিঙ্গত্রয় তন্ত্র॥
অকার উকার আর মকার নির্দ্দেশ।
ওঁ হরি কৃষ্ণ রাম নামের বিশেষ॥
হরি হইতে অভিন্ন সকল হরিনাম।
বাচ্যবাচকভেদে পূর্ণ করে কাম॥
────────────────────
অতএব,—শ্রীচৈতন্যভাগবতে (মধ্য—২৩শ পরিচ্ছেদ ৭৬-৭৮)
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে॥৩০॥
প্ৰভু কহে কহিলাঙ এই মহামন্ত্ৰ।
ইহা গিয়া জপ সবে করিয়া নির্ব্বন্ধ॥
ইহা হৈতে সৰ্ব্বসিদ্ধি হইবে সবার।
সৰ্ব্বক্ষণ বল ইথে বিধি নাহি আর॥
────────────────────
যথা,—(ভঃ রঃ সিঃ পূঃ বিঃ সাধনভক্তি লহরী ৪৭ অঙ্ক)
সদ্ধৰ্ম্মস্যাববোধায় যেষাং নিৰ্ব্বন্ধিনী মতিঃ।
অচিরাদেব সর্ব্বার্থঃ সিদ্ধত্যেষামভীপ্সিতঃ॥৩১॥
সদ্ধর্ম্ম জানিবার নিমিত্ত যাঁহাদের মতি নিৰ্ব্বন্ধিনী (অতিশয় আগ্রহশীলা) হইয়াছে, অচিরকাল মধ্যেই তাঁহাদের অভীষ্ট সর্ব্বার্থ সিদ্ধ হইয়া থাকে॥৩১॥
নিৰ্ব্বন্ধিনী মতি সহ কৃষ্ণনাম করে।
অতিশীঘ্র প্রেমফল সেই নামে ধরে॥
────────────────────
নিৰ্ব্বন্ধ যথা,—
তুলসীকাষ্ঠঘটিতৈর্মণিভির্জপমালিকা।
সৰ্ব্বকৰ্ম্মাণি সৰ্ব্বেষামীপ্সিতার্থফলপ্রদা॥
গোপুচ্ছসদৃশী কাৰ্য্যা যদ্বা সর্পাকৃতিঃ শুভা।
তৰ্জ্জন্যা ন স্পৃশেৎ সূত্রং কম্পয়েন্ন বিধুনয়েৎ॥
অঙ্গুষ্ঠপৰ্ব্বমধ্যস্থং পরিবর্তং সমাচরেৎ।
ন স্পৃশেদ্ বামহস্তেন করভ্রষ্টাং ন কারয়েৎ।
ভুক্তৌ মুক্তৌ তথাকৃষ্টৌ মধ্যমায়াং জপেৎ সুধীঃ॥৩২॥
তুলসীকাষ্ঠমণি নিৰ্ম্মিতা জপমালিকা সকল কৰ্ম্মে সকলের ঈপ্সিত ফল প্রদান করে। গোপুচ্ছ সদৃশী অথবা সুন্দর সর্পাকৃতি মালা শুভদায়িনী। তর্জ্জনীর দ্বারা সূত্র (অর্থাৎ মালা) স্পর্শ করিবে না, কম্পিত করিবে না, নিক্ষেপ করিবে না, অঙ্গুষ্ঠ পর্ব্বের মধ্যে রাখিয়া পরিবর্ত্ত (ঘূর্ণন) আচরণ করিবে। বাম হস্তের দ্বারা মালা স্পর্শ করিবে না এবং করভ্রষ্ট করিবে না। বুদ্ধিমান্ ব্যক্তি ভুক্তি, মুক্তি এবং আকর্ষণ-বিষয়ে মধ্যমায় রাখিয়া জপ করিবেন॥৩২॥
────────────────────
তত্ৰ নিয়মাঃ,
মনঃ সংহরণং শৌচং মৌনং মন্ত্রার্থচিন্তনম্।
অব্যগ্রত্বমনিৰ্ব্বেদো জপসম্পত্তিহেতবঃ॥৩৩॥
মনের সংহরণ অর্থাৎ বিষয় হইতে প্রত্যাহারের নাম শৌচ, মন্ত্ৰাৰ্থ চিন্তনের নাম মৌন, অব্যগ্রতার নাম অনির্ব্বেদ—এই সকল জপরূপ সম্পত্তির হেতু হইয়া থাকে॥৩৩॥
জপকালে মনকে একাগ্রভাবে লও।
চিত্তে শুদ্ধ থাক, বৃথা কথা নাহি কও॥
নামার্থ চিন্তহ সদা ধৈর্য্যাশ্রয় কর।
নামেতে আদর করি' কৃষ্ণনাম স্মর॥
────────────────────
নামার্থাঃ, যথা—শ্রীগোপালগুরুধৃতস্বরূপসিদ্ধান্তবাক্যম্।
বিজ্ঞাপ্য ভগবত্তত্ত্বং চিদঘনানন্দবিগ্রহম্।
হরত্যবিদ্যাং তৎকার্য্যমতো হরিরিতি স্মৃতঃ॥
হরতি শ্রীকৃষ্ণমনঃ কৃষ্ণাহ্লাদস্বরূপিণী।
অতো হরেত্যনেনৈব শ্রীরাধা পরিকীর্তিতা॥
আনন্দৈকসুখস্বামী শ্যামঃ কমললোচনঃ।
গোকুলানন্দনো নন্দনন্দনঃ কৃষ্ণ ঈৰ্য্যতে॥
বৈদগ্ধী-সারসর্বস্বং মূৰ্ত্তিলীলাধিদৈবতম্।
রাধিকাং রময়ন্নিত্যং রাম ইত্যভিধীয়তে॥৩৪॥
যিনি চিদ্ঘনানন্দ-বিগ্রহরূপ ভগবত্তত্ত্ব জানাইয়া, তাহার দ্বারা অবিদ্যা হরণ করেন, এই নিমিত্ত তিনি ‘হরি’ বলিয়া স্মৃত হইয়াছেন। শ্রীকৃষ্ণের আহ্লাদ-স্বরূপিণী শ্রীমতী রাধিকা শ্রীকৃষ্ণের মন হরণ করেন বলিয়া, ‘হরা’–এই নামে কীৰ্ত্তিতা হন। যিনি আনন্দের একমাত্র অধিকারী, শ্যামরূপ, পদ্মলোচন, গোকুলের আনন্দ-বিধায়ক, শ্রীনন্দের নন্দন, তিনি ‘কৃষ্ণ’–এই নামে স্তুত হন। তিনি বৈদগ্ধীর সার-সৰ্ব্বস্ব-মূৰ্ত্তি লীলাধিদেবতা, শ্রীরাধিকাকে নিত্যই আনন্দ প্রদান করেন বলিয়া ‘রাম’–এই নামে অভিহিত হইয়া থাকেন॥৩৪॥
চিদঘন আনন্দরূপ শ্রীভগবান্।
নামরূপে অবতার এইত প্রমাণ॥
অবিদ্যাহরণ কার্য্য হৈতে নাম হরি।
অতএব হরে কৃষ্ণ নামে যায় তরি॥
কৃষ্ণাহ্লাদস্বরূপিণী শ্রীরাধা আমার।
কৃষ্ণমন হরে তাই হরা নাম তাঁর॥
রাধাকৃষ্ণ শব্দে শ্রীসচ্চিদানন্দ রূপ।
হরেকৃষ্ণ শব্দে রাধাকৃষ্ণের স্বরূপ॥
আনন্দ স্বরূপ রাধা তাঁর নিত্য স্বামী।
কমললোচন শ্যাম রাধানন্দকামী॥
গোকুল আনন্দ নন্দনন্দন শ্ৰীকৃষ্ণ।
রাধাসঙ্গে সুখাস্বাদে সৰ্ব্বদা সতৃষ্ণ॥
বৈদগ্ধ্য সার সর্বস্ব মূর্ত্ত লীলেশ্বর।
শ্রীরাধারমণ রাম নাম অতঃপর॥
হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র শ্রীযুগল নাম।
যুগল লীলার চিন্তা কর অবিরাম॥
────────────────────
অতএব, (বৃহন্নারদীয় পুরাণে)
হরের্নাম হরের্নাম হরের্নামৈব কেবলম্।
কলৌ নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব গতিরন্যথা॥৩৫॥
কলিকালে একমাত্র হরিনামই সার, হরিনামই সার, হরিনামই সার। কলিকালে নাম ভিন্ন জীবের আর অন্য গতি নাই, আর অন্য গতি নাই, আর অন্য গতি নাই॥৩৫॥
অন্য ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম ছাড়ি হরিনাম সার।
কলিযুগে তাহা বিনা গতি নাহি আর॥
────────────────────
যথা, ভাগবতে—
নক্তং দিবা চ গতভীর্জিতনিদ্র একো
নির্ব্বিণ্ণ ঈক্ষিতপথো মিতভুক্ প্ৰশান্তঃ।
যদ্যচ্যুতে ভগবতি স্বমনো ন সঙ্গেন্-
নামানি তদ্রতিকরাণি পঠেদ্বিলজ্জঃ॥৩৬॥
রাত্রি দিন নির্ভয়ে জিতনিদ্র হইয়া, একাকী বিষয়াসক্তি পরিহারপূর্ব্বক পরিমিত আহার গ্রহণ করতঃ নিৰ্ম্মল চিত্তে চিন্তামগ্ন হইয়াও যদি মন ভগবান্ অচ্যুতে সংযুক্ত করিতে না পার, তবে বিলজ্জ (লোকাপেক্ষাশূন্য) হইয়া ভগবানের রতি উৎপন্নকারক নামসকল উচ্চারণ কর॥৩৬॥
রাত্রদিন উন্নিদ্র নির্বিঘ্ন নিৰ্ভয়।
মিতভুক্ প্রশান্ত নিৰ্জ্জনে চিত্তাময়॥
লজ্জা ত্যজি’ কৃষ্ণরতি উদ্দীপক নাম।
উচ্চারণ করে ভক্ত কৃষ্ণাসক্তিকাম॥
────────────────────
যথা,—ভাগবতে, (৬। ৩। ২২)
এতাবানের লোকেঽস্মিন্ পুংসাং ধর্ম্মঃ পরঃ স্মৃতঃ।
ভক্তিযোগো ভগবতি তন্নামগ্রহণাদিভিঃ॥৩৭॥
নাম সঙ্কীর্তনাদির দ্বারা ভগবান্ বাসুদেবে যে ভক্তিযোগ, তাহাই ইহলোকে পুরুষদিগের পরম ধর্ম্ম বলিয়া স্মৃত হইয়াছে॥৩৭॥
ভক্তিযোগ কৃষ্ণনামগ্রহণাদি রূপ।
পরো ধর্ম্ম নামে তার নির্ণীত স্বরূপ॥
────────────────────
কৃষ্ণলীলা চিন্তা,—
নিশান্তে কীৰ্ত্তনে কুঞ্জভঙ্গ করে ধ্যান।
ক্রমে ক্রমে চিত্ত লগ্নে রসের বিধান॥
রাত্র্যন্তে ত্রস্তবৃন্দেরিতবহুবিরবৈর্বোধিতৌ কীরশারী-
পদ্যৈর্হৃদ্যৈরহৃদ্যৈরপি সুখশয়নাদুত্থিতৌ তৌ সখীভিঃ।
দৃষ্টৌ হৃষ্টৌ তদাত্বোদিতরতিললিতৌ কক্খটীগীঃসশঙ্কৌ
রাধাকৃষ্ণৌ সতৃষ্ণাবপি নিজনিজধাম্ন্যাপ্ততল্পৌ স্মরামি॥৩৮॥
(শ্রীগোবিন্দলীলামৃতে)
দিবসাগম-শঙ্কিতা বৃন্দা শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণের নিদ্রাভঙ্গের জন্য নিশান্তে শুক-শারিকা প্রভৃতি যে সকল পক্ষীকে আদেশ করিয়াছিলেন, তাহাদের কলরবে এবং প্রিয় ও অপ্রিয় (হৃদ্যৈঃ অহৃদ্যৈঃ অপি) কবিতা পাঠের শব্দে প্রবোধিত—তৎকালোচিত রতিরভসে পরম কমনীয়—দূর হইতে সখীগণ কর্তৃক দৃষ্ট—‘কক্খটী' নামক বানরীর চীৎকারে শঙ্কিত সেই শ্রীরাধা ও শ্রীকৃষ্ণ পরস্পরের প্রতি সতৃষ্ণনয়নে অবলোকন করিতে করিতে নিজ নিজ ভবনে গমনপূর্ব্বক শয্যায় শয়ন করিলেন॥৩৮॥
দেখিয়া অরুণোদয়, বৃন্দাদেবী ব্যস্ত হয়,
কুঞ্জে নানা রব করাইল।
শুক শারী পদ্য শুনি, উঠে রাধা নীলমণি,
সখীগণ দেখি হৃষ্ট হৈল।
কালোচিত সুললিত, কক্খটীর রবে ভীত,
রাধাকৃষ্ণ সতৃষ্ণ হইয়া।
নিজ নিজ গৃহে গেলা, নিভৃতে শয়ন কৈলা,
দুঁহে ভজি সে লীলা স্মরিয়া॥
এই লীলা স্মর আর গাও কৃষ্ণনাম।
কৃষ্ণলীলা প্রেমধন পাবে কৃষ্ণধাম॥
ইতি শ্রীশ্রীভজনরহস্যে নিশান্তভজনং বা প্রথমযাম ভজন-প্রকারবর্ণনম্॥